গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলা সদরে কয়েক লাখ টাকা মূল্যের মেহগনি গাছসহ সরকারি খাস জমি রক্ষায় স্থানীয় ভূমি প্রশাসনের বিরুদ্ধে গাফিলতি, রহস্যজনক ভূমিকা ও স্ববিরোধী অবস্থানের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী একটি পক্ষ সরকারি সম্পত্তি দখলে রাখলেও বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো দায় এড়ানোর চেষ্টা চলছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
সরকারি গেজেট, রেকর্ড ও নকশায় জমির অবস্থান স্পষ্টভাবে চিহ্নিত থাকলেও সরেজমিনে পরিমাপের সময় সাদুল্লাপুরের উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জসিম উদ্দিন দাবি করেছেন, জমিটি ‘রাস্তায় মিশে গেছে’ অথবা ‘খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না’। এসিল্যান্ডের এমন বক্তব্য সরকারি রেকর্ড, গেজেট ও খোদ ভূমি অফিসেরই তদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে এবং সহকারী কমিশনারের (ভূমি) বিরুদ্ধে দায়িত্বহীনতা ও প্রশাসনিক অসঙ্গতির অভিযোগ তুলে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন শিক্ষানবিশ আইনজীবী মো. জিল্লুর রহমান মন্ডল পলাশ।
গত বুধবার (১৩ মে) দাখিল করা লিখিত অভিযোগে বলা হয়, সাদুল্লাপুর মৌজার জেএল নম্বর-৪১ এর বিআরএস ১ নম্বর খতিয়ানভুক্ত ৫৮৯ নম্বর দাগের ০.০০৫৬ একর সরকারি খাস জমি দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিবিশেষের অবৈধ দখলে রয়েছে। ওই জমিতে থাকা প্রায় ৩ লাখ টাকা মূল্যের ৭টি বৃহদাকৃতির মেহগনি গাছও বর্তমানে ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি গেজেট ও নকশায় জমির অস্তিত্ব সুস্পষ্ট থাকলেও গত ২৩ এপ্রিল সরেজমিন পরিদর্শনের সময় সহকারী কমিশনার (ভূমি) দাবি করেন, জমিটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ এর আগে ওই অফিসেরই তদন্ত প্রতিবেদন ও নোটিশে জমিটিকে ‘সরকারি খাস জমি’ এবং গাছগুলোকে ‘সরকারি সম্পদ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। প্রশাসনের এমন পরস্পরবিরোধী অবস্থানে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
নথি সূত্রে জানা গেছে, খাস জমি ও গাছ সংক্রান্ত পৃথক দুটি আবেদনের পর বনগ্রাম ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সার্ভেয়াররা সরেজমিন তদন্ত করে জমি ও গাছের অস্তিত্ব নিশ্চিত করেন। পরবর্তীতে গত ৩০ মার্চ ও ২ এপ্রিল (২০২৬) তারিখের তদন্ত প্রতিবেদনে (স্মারক নম্বর-৩৩ ও ৩৮) প্রায় ৩ লাখ টাকা মূল্যের ৭টি মেহগনি গাছসহ খাস জমির উপস্থিতি উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, খাস জমিটি আবেদনকারীদের দখলে থাকায় বন্দোবস্ত দেওয়া যেতে পারে এবং গাছগুলো নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করলে সরকার উল্লেখযোগ্য রাজস্ব পাবে।
তবে তদন্তে সরকারি সম্পদের অস্তিত্ব নিশ্চিত হওয়ার পরও এখন পর্যন্ত কোনো উদ্ধার অভিযান বা সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো বিগত ২০২৫ সালের ১৯ মে এক আবেদনে সরেজমিন তদন্তের পর জমিটিকে ব্যক্তিমালিকানাধীন দাবি করে ‘সরকারের কোনো স্বার্থ নেই’ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে একই অফিস থেকে স্মারক নম্বর ৩০০ ও ৩১১ এর নোটিশে আবার সেটিকে সরকারি সম্পত্তি বলা হয়। একই বিষয়ে প্রশাসনের এমন দ্বৈত অবস্থান সচেতন মহলকে বিস্মিত করেছে। পাশাপাশি এসিল্যান্ড গত ১২ এপ্রিল অফিস স্মারকের এক নোটিশে উক্ত জমিতে ‘সরকারি স্বার্থ’ ও ‘গাছ’ থাকার বিষয়টি লিখিতভাবে স্বীকার করলেও পরে সরেজমিনে এসে জমির অস্তিত্ব অস্বীকার করেন।
দখলদারের আবেদনেই সরকারি জমির স্বীকৃতি
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, স্থানীয় প্রভাবশালী জাকিউল হক মানিক ও জাহিদুল ইসলামসহ তাদের পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারি খাস জমি ও গাছ নিজেদের সীমানাপ্রাচীরের ভেতরে নিয়ে গোপনে দখলে রেখেছেন। বিষয়টি জানাজানি হলে গত মার্চ মাসে জাকিউল হক মানিক নিজেই ওই জমি বন্দোবস্ত চেয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর লিখিত আবেদন করেন।
উক্ত আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, তার মা জোবেদা বেওয়ার নামে বিআরএস ২৩৮ নম্বর খতিয়ানে ০.০৩৬৯ একর জমির সঙ্গে অতিরিক্ত ০.০০৫৬ একর সরকারি খাস জমি মিলিয়ে মোট ০.০৪২৫ একর জমি তাদের ভোগদখলে রয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, এই আবেদনের মাধ্যমেই সরকারি জমি দখলের বিষয়টি পরোক্ষভাবে প্রমাণিত হয়।
মামলার আড়ালে সম্পদ গোপনের চেষ্টা
সিএস ৩০৩ নম্বর খতিয়ানের সাবেক ৫২৬ নম্বর দাগের মোট ২৪ শতক জমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দেওয়ানি আদালতে বাটোয়ারা মামলা চললেও বিআরএস ৫৮৯ নম্বর দাগের সরকারি খাস জমি ওই মামলার অন্তর্ভুক্ত নয়।
আদালত কখনো সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ বা গোপনের অনুমতি দেয়নি। অথচ আদালতের মামলার অজুহাতে সরকারি খাস জমি ও গাছ প্রভাবশালী ব্যক্তির দখলে রাখার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ গাছে জননিরাপত্তা হুমকি
খাস জমিতে অবস্থিত বৃহদাকৃতির মেহগনি গাছগুলো বর্তমানে স্থানীয় বসতবাড়ি, দোকানপাট, সড়ক ও বৈদ্যুতিক খুঁটির জন্য চরম ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বছর বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) অবহিত করা হলে দুই দফা তদন্ত হয়।
সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২২ জুলাই চার সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গাছগুলোকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করলেও এখন পর্যন্ত তা অপসারণ বা নিলামের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে কালবৈশাখীর এই মৌসুমে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগকারী মো. জিল্লুর রহমান মন্ডল পলাশ বলেন, আমার ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ নেই; সরকারি সম্পদ রক্ষা ও জনস্বার্থ নিশ্চিত করাই মূল উদ্দেশ্য। সরকারি রেকর্ডভুক্ত সম্পদ কীভাবে গায়েব দেখানো হয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযোগটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘আমি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আদালতে চলমান জমি বিরোধের চূড়ান্ত রায় আমি মেনে নেব।’
অভিযোগ ও সরেজমিনে জমি পরিমাপের বিষয়ে জানতে চাইলে সাদুল্লাপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জসিম উদ্দিন বলেন, খাস জমি বন্দোবস্ত চেয়ে দুজন আবেদন করায় সরেজমিনে পরিমাপ করা হয়। সরকারি ১ নম্বর খতিয়ানের রেকর্ড অনুযায়ী হাল ৫৮৯ নম্বর দাগে ০.০০৫৬ একর খাস জমি থাকার তথ্য পাওয়া গেলেও মাঠপর্যায়ে পরিমাপে পুরো প্লটে ২৪ শতাংশ জমি পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, ধারণা করা হচ্ছে, খাস জমিটি রাস্তায় মিশে গেছে। এ কারণে আলাদাভাবে তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া জমিটি নিয়ে আদালতে মামলাও চলছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ব্যক্তিমালিকানা নিয়ে মামলা থাকলেও খাস খতিয়ানভুক্ত জমি ও গাছ সরকারের সম্পদ। তাই দ্রুত এই সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পাশাপাশি দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।